শঙ্কায় আন্দোলনকারীরা
ফেনীর মহিপালে ৭ জন নিহতের ঘটনায় বিচার দাবি, শঙ্কায় আন্দোলনকারীরা
প্রকাশিত: ০৩/০৮/২০২৬ ০৫:৩৭:২২ অপরাহ্ন
ছবি: ।
চব্বিশের ৪ আগস্ট। স্বৈরাচারবিরোধী একদফা আন্দোলনের ঢেউ যখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন উত্তাল ছিল ফেনীর মহিপাল। শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সশস্ত্র নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় মহিপাল এলাকা। গুলিতে প্রাণ হারান সাত আন্দোলনকারী। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেদিনের বিভীষিকাময় চিত্র। তাদের ভাষ্য, সকাল থেকেই ফেনীর মহিপালে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন ছাত্র-জনতা। অন্যদিকে শহরের ট্রাংক রোডে অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা। দুপুরের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় গুলিবর্ষণ। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল এলাকায় সাতজন নিহত হন। এর একদিন পর, ৫ আগস্ট, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে। তবে সরকার পরিবর্তনের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মহিপাল হত্যাকাণ্ডের মূল আসামিদের কেউ গ্রেফতার হননি বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের। অস্ত্রধারীদের অনেকের অবস্থানও এখনো অজানা। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৪ আগস্ট সকাল থেকে জেলার ছয় উপজেলা থেকে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হন। তারা স্লোগান দিতে থাকেন। বেলা ১টার দিকে যোহরের আজান হলে মহাসড়কেই নামাজ আদায়ের প্রস্তুতি নেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় ট্রাংক রোডের দিক থেকে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা মহিপালের দিকে এগিয়ে এসে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। ঘটনাস্থলেই নিহত হন পাঁচজন। গুলিবিদ্ধ হন শতাধিক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। হামলাকারীরা সরে যাওয়ার পর আহতদের ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। ফেনীতে নিহত সাতজন হলেন—শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, মো. মাহবুবুল হাসান, মো. সারোয়ার জাহান, ওয়াকিল আহমেদ, ছাইদুল ইসলাম, জাকির হোসেন ও অটোরিকশাচালক মো. সবুজ। এ ছাড়া আন্দোলনে অংশ নিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আরও চার ফেনীবাসী নিহত হন। এ ঘটনায় ফেনী সদর মডেল থানায় ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা ও ১৫টি হত্যাচেষ্টার মামলা। তিনটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় ২ হাজার ১৯৯ জনকে এজাহারভুক্ত এবং আরও ৪ হাজার জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনীর সাবেক তিন সংসদ সদস্যসহ জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতনামাসহ সহস্রাধিক আসামিকে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে ১১ জন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে মূল পরিকল্পনাকারী ও অধিকাংশ অস্ত্রধারী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের দিন অন্তত ৩০ জনের হাতে পিস্তল, রাইফেল ও শটগান ছিল। এদের মধ্যে নূর নবী মেম্বার ও যুবলীগ নেতা সম্রাট গ্রেফতার হয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে অন্যদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি এবং তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফেনীর সাবেক জেলা সমন্বয়ক ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব মুহাইমিন তাজিম যুগান্তরকে বলেন, সংঘাত এড়াতেই আমরা মহিপালকে কর্মসূচির স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। সেখানে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলছিল। কিন্তু সশস্ত্র হামলা চালিয়ে আমাদের ওপর গুলি করা হয়। দুই বছর পরও সেই স্মৃতি আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সেদিনের হত্যাকাণ্ডে জড়িত অনেকেই এখনো এলাকায় কিংবা দেশে অবস্থান করছেন। তারা বিভিন্নভাবে হুমকিও দিচ্ছেন। এটি প্রশাসনের ব্যর্থতা। নিরাপত্তা ও বিচার—কোনোটিই নিশ্চিত করা যায়নি। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন, শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং সব হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। ফেনী মডেল থানার ওসি ফৌজুল আজিম বলেন, অস্ত্রধারীদের অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনো জানা যায়নি। বিভিন্ন ইউনিট অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, অস্ত্রগুলো অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া হত্যা ও সহিংসতার মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, মহিপাল হত্যাকাণ্ডে সাতটি হত্যা ও ১৫টি আহতের মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় আড়াই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ সুপার বলেন, যারা অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে, তাদের অধিকাংশই পলাতক। তবে তাদের গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এইচ বি বা