প্রকাশিত

২৯/০৮/২০২৬ ০৭:৫৪:১৯ অপরাহ্ন

আন্তর্জাতিক

নেপালের ভোটেকোশি নদীর ভয়াবহ বন্যায় চারপাশের বসতি প্রায় নিশ্চিহ্ন

ধ্বংসস্তূপে টিকে থাকা প্রতিবন্ধী দম্পতির ঘর এখন আশ্রয়কেন্দ্র

প্রকাশিত: ২৯/০৮/২০২৬ ০৭:৫৪:১৯ অপরাহ্ন

ছবি: ।

ধ্বংসস্তূপে টিকে থাকা প্রতিবন্ধী দম্পতির ঘর এখন আশ্রয়কেন্দ্র
পাহাড়ের ঢালে টিনের ছাউনি দেওয়া এই ছোট ঘরটি এখন হয়ে উঠেছে বিপদগ্রস্ত মানুষের আশ্রয়স্থল।

নেপালের ভোটেকোশি নদীর ভয়াবহ বন্যায় চারপাশের বসতি প্রায় নিশ্চিহ্ন। কংক্রিটের ঘরগুলো পানিতে ডুবে আছে, কোথাও আবার ঘরবাড়ি ও সড়কের চিহ্নও নেই।
এর মাঝেই পাহাড়ের ঢালে টিনের ছাউনি দেওয়া একটি ছোট ঘর এখন হয়ে উঠেছে বিপদগ্রস্ত মানুষের আশ্রয়স্থল।
বুধবারের বন্যার দিন উত্তর্গায়া পাবলিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে আসা ৩১ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রাত কাটিয়েছিলেন এই ঘরে।
এরপর থেকে নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে আসা মানুষেরও আশ্রয় হয়ে উঠেছে ঘরটি। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন এখানে আসছেন।
বন্যার পর এখন পর্যন্ত ২০০ জনের বেশি মানুষ এই ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।
ঘরটির মালিক প্রেম বাহাদুর তামাং ও তার স্ত্রী মাইয়া দুজনই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবনযাপন করছেন।
মেরুদণ্ডে আঘাতের কারণে প্রেম বাহাদুর লাঠির সাহায্যে কষ্ট করে চলাফেরা করেন। মাইয়ার বাঁ পায়েও চলাচলে সমস্যা রয়েছে। নিজেদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দরজায় আসা কাউকেই খালি হাতে ফেরাচ্ছেন না তারা।
সরকারি সহায়তা এখনও পর্যাপ্তভাবে ওই এলাকায় পৌঁছায়নি। ফলে নিজেদের সামান্য সঞ্চয় থেকেই আশ্রয় নেওয়া মানুষদের পানি, খাবার ও ঘুমানোর জায়গা দিচ্ছেন এই দম্পতি।
মাইয়া জানান, তার স্বামী মাসে ৩ হাজার নেপালি রুপি এবং তিনি ২ হাজার রুপি বয়স্ক ভাতা পান। সন্তানরাও মাঝেমধ্যে টাকা পাঠান। এভাবেই তাদের সংসার চলে। পাহাড়ি জমিতে উৎপাদিত শস্যে সারা বছর চলে না। তার ওপর বানরের উৎপাতেও ফসল রক্ষা করা কঠিন।
বন্যার দিনের ভয়াবহতা স্মরণ করে প্রেম বাহাদুর বলেন, নদীর গর্জন শুনে লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি কাছে গিয়ে দেখেন পানির স্রোতে মানুষ ও ঘরবাড়ি ভেসে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘চোখের সামনে মানুষ ভেসে যাচ্ছিল, ঘরবাড়ি মাটির নিচে চাপা পড়ছিল। আমরা কাউকে উদ্ধারে যাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বেত্রাবতী বাজার নদীতে তলিয়ে গেল। সড়ক, স্কুল, বাস সব ভেসে গেল।’
চার প্রজন্ম ধরে ওই এলাকায় বসবাস করা প্রেম বাহাদুর বলেন, এমন দুর্যোগ তিনি আগে কখনো দেখেননি। তার ভাষায়, ‘এটা বন্যার মতোও লাগছিল না। মনে হচ্ছিল যেন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ হয়েছে।’
মাইয়া বলেন, তাদের চাল-ডালের মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তবু যতদিন সম্ভব মানুষকে খাওয়াতে চান তিনি।
‘আমরা আর কী করতে পারি? স্বাভাবিক সময়ে সবাই নিজের খাবার নিজে রান্না করে খেতে পারে। কিন্তু এমন সময়ই তো আমাদের একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হয়। আমরা যতটুকু পারি, করছি,’ বলেন তিনি।
তাদের স্বজনদের মধ্যেও রয়েছেন বন্যার শিকার মানুষ। মাইয়ার ভাশুর জুহানলাল তামাং পরিবার নিয়ে ওই ঘরেই আশ্রয় নিয়েছেন। তার নাতি ভোটেকোশির স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর এখনও নিখোঁজ। একই ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন হরিবাহাদুর রাই। আঙ্গিতারে তার বাড়ি ভেসে গেছে। স্ত্রী, নাতনি, শাশুড়ি ও শ্বশুর নিখোঁজ।
ছোট ঘরটিতে এখন অনেক পরিবার একসঙ্গে থাকছে। মাইয়া বলেন, ‘ঘর ছোট হলেও আমরা সবাই ভেতরে-বাইরে মিলেমিশে থাকছি, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিচ্ছি।’
তবে তাদের খাবারের মজুত আর মাত্র কয়েক দিনের। মাইয়া বলেন, ‘আমরা বাইরে গিয়ে খাবার-পানি আনতে পারি না। কোথাও থেকে যদি কিছু সরবরাহ আসত, তাহলে অন্তত আশ্রয়ের জন্য আসা মানুষকে খালি পেটে ফেরাতে হতো না।’
দম্পতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। কেউ তাদের সঙ্গে থাকেন না। বড় ছেলে বিশাল কাজের জন্য ভারতে। ছোট ছেলে বুদ্ধ ত্রিশূলী-বেত্রাবতী সড়কে অটোরিকশা চালিয়ে আয় করতেন। বন্যায় তার অটোরিকশার পাশাপাশি জীবিকার সেই পথও ধ্বংস হয়ে গেছে।
বুদ্ধ বলেন, ‘এখন আমরা কী করব? আমার বাবা-মা দুজনই প্রতিবন্ধী, আমাদের পরিবার এমনিতেই সংগ্রাম করছে। যেকোনো কাজ পেলে আমি করতে রাজি।’
এখনও কোনো সরকারি সংস্থা ওই এলাকায় পৌঁছাতে পারেনি। নদীতে ভেসে থাকা মরদেহগুলো পচতে শুরু করেছে। ঘরের ভেতর আটকে থাকা মরদেহও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এই ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রেম বাহাদুর ও মাইয়ার ছোট্ট ঘরটিই এখন নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে আসা ও ঘরহারা মানুষের নিরাপদ আশ্রয়।


আন্তর্জাতিক/তা/৫