খেক্রীড়া হতে পারে নতুন অর্থনীতির চালিকাশক্তি
খেলা নয় শুধু, ক্রীড়া হতে পারে নতুন অর্থনীতির চালিকাশক্তি
প্রকাশিত: ২৯/০৭/২০২৬ ০৬:৩০:০০ অপরাহ্ন
ছবি: ।
একটি গোল। একটি ছক্কা। একটি পদক। মাঠের এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই কখনও কখনও বদলে দেয় একটি দেশের পরিচয়। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে ক্রীড়ার গল্প এখন আর শুধু জয়-পরাজয়ের নয়। মাঠের বাইরেও তৈরি হচ্ছে এক বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। যেখানে খেলোয়াড়ের ঘামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ব্যবসার নতুন সম্ভাবনা। বাংলাদেশে অবশ্য ক্রীড়া নিয়ে আমাদের ভাবনা এখনও অনেকটাই স্কোরবোর্ডে আটকে আছে। কে জিতল, কে হারল, কোন খেলোয়াড় কত রান করলেন, কোন দল ট্রফি তুলল—আলোচনার কেন্দ্র সেখানেই। কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশ অনেক আগেই বুঝে ফেলেছে, ক্রীড়া শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প। একটি শক্তিশালী ক্রীড়া শিল্পের সঙ্গে শুধু মাঠের খেলোয়াড়রা নন, জড়িয়ে থাকেন হাজার হাজার মানুষ। একজন কোচ, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট, ভিডিও অ্যানালিস্ট, পারফরম্যান্স বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ, স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট, ডিজিটাল মার্কেটার, ব্রডকাস্টার, ইভেন্ট ম্যানেজার সবাই মিলে তৈরি করেন একটি ক্রীড়া অর্থনীতি। একজন খেলোয়াড় যখন মাঠে নামেন, তখন তাঁর পেছনে কাজ করে একটি বিশাল অদৃশ্য শক্তি। সেই শক্তিই তৈরি করে কর্মসংস্থান, ব্যবসা এবং বিনিয়োগের নতুন পথ। বিশ্বের বড় ক্রীড়া শক্তিগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ক্রীড়া এখন কত বড় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। ইউরোপের ফুটবল লিগগুলো শুধু খেলা নয়, একেকটি বিশাল ব্যবসায়িক কাঠামো। একটি ম্যাচ মানে শুধু ৯০ মিনিট নয়,এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, টিকিট, পর্যটন, হোটেল, পরিবহন, খাবার, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং মার্চেন্ডাইজ ব্যবসা। ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, আইপিএল কিংবা উইম্বলডনের প্রতিটি আয়োজনই তৈরি করে বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। একটি বিশ্বকাপের জন্য নির্মিত হয় নতুন অবকাঠামো, বাড়ে পর্যটন, তৈরি হয় হাজার হাজার কর্মসংস্থান। আইপিএলের মতো একটি লিগ ক্রিকেটের পাশাপাশি তৈরি করেছে একটি বিশাল ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম। বাংলাদেশের সামনেও রয়েছে একই সম্ভাবনার দরজা। আমাদের রয়েছে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রীড়াপ্রেমী দর্শক এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল বাজার। কিন্তু এখনো আমরা ক্রীড়াকে শিল্প হিসেবে দেখতে শেখেনি। ফলে ক্রীড়াকে ঘিরে তৈরি হতে পারত যে বিশাল কর্মসংস্থান, তার বড় অংশই রয়ে গেছে অপ্রকাশিত। বিপিএল, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সিরিজ, ঢাকা ম্যারাথন কিংবা অন্যান্য বড় আয়োজনকে যদি শুধু কয়েক দিনের অনুষ্ঠান হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রকল্প হিসেবে পরিকল্পনা করা যায়, তাহলে বদলে যেতে পারে চিত্র। সম্প্রচার, ডিজিটাল কনটেন্ট, পর্যটন, বিজ্ঞাপন, প্রযুক্তি, ইভেন্ট ব্যবস্থাপনায় তৈরি হতে পারে নতুন বাজার। সবচেয়ে বড় লাভ হবে তরুণদের জন্য। আজ একজন তরুণ খেলোয়াড় না হলেও ক্রীড়ার সঙ্গে যুক্ত থেকে সফল ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। একজন প্রযুক্তিবিদ হতে পারেন ডেটা বিশ্লেষক, একজন জীববিজ্ঞান শিক্ষার্থী হতে পারেন স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট, একজন ফিজিওথেরাপিস্ট হতে পারেন আন্তর্জাতিক মানের রিহ্যাব বিশেষজ্ঞ, একজন মিডিয়া শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারেন ক্রীড়া কনটেন্টের নতুন জগৎ। প্রযুক্তির যুগে ক্রীড়ার চেহারাও বদলে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,ডেটা অ্যানালিটিক্স, পারফরম্যান্স ট্র্যাকিং এখন খেলাধুলার অংশ। একটি দলের সাফল্যের পেছনে যেমন থাকে খেলোয়াড়ের দক্ষতা, তেমনই থাকে প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহার। বাংলাদেশ যদি এখন থেকেই স্পোর্টস সায়েন্স ল্যাব, আধুনিক একাডেমি, গবেষণা কেন্দ্র এবং স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে তৈরি হতে পারে নতুন দক্ষ জনশক্তি। ক্রীড়া তখন শুধু পদক জয়ের পথ নয়, হয়ে উঠবে পেশা তৈরির ক্ষেত্র। তবে এর জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। লিগ, একাডেমি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ক্রীড়া প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে। কারণ আধুনিক ক্রীড়া শুধু আবেগ দিয়ে চলে না, চলে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ওপর। এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রীড়া সাংবাদিকতা শুধু ম্যাচের ফলাফল বা খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ক্রীড়া অর্থনীতি, নতুন পেশা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা এবং উদ্ভাবনের গল্পও সামনে আনতে হবে। একটি বড় ক্রীড়া আয়োজন যেমন একটি শহরের অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে, তেমনই একটি সঠিক ক্রীড়া নীতি বদলে দিতে পারে একটি দেশের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি ক্রীড়াকে শুধু মাঠের বিনোদন হিসেবে দেখব, নাকি অর্থনীতির নতুন শক্তি হিসেবে গ্রহণ করব? ক্রীড়ার মাঠে শুধু গোল হয় না, তৈরি হয় সম্ভাবনার নতুন দিগন্তও। সঠিক পরিকল্পনা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সমন্বিত বিনিয়োগ থাকলে ক্রীড়াই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপ্লবের অন্যতম চালিকাশক্তি। সাকিফ শামীম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশন
এইচ বি বা