প্রকাশিত

০১/০৯/২০২৬ ০৯:১৪:২২ অপরাহ্ন

মতামত

পথচলার সেই দীর্ঘ ইতিবৃত্তে আজ ৪৮ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)

৪৮ বছরে বিএনপি: ১৯ দফা থেকে ৩১ দফা

প্রকাশিত: ০১/০৯/২০২৬ ০৯:১৪:২২ অপরাহ্ন

ছবি: ।

নদীমাতৃক এই পলিমাটির দেশে রাজনীতির গতিপথও বহমান নদীর মতোই আঁকাবাঁকা। কখনো উত্তাল, কখনো শান্ত।
পথচলার সেই দীর্ঘ ইতিবৃত্তে আজ ৪৮ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক বিশেষ রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিতে জন্ম নেওয়া দলটি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে পার করেছে অজস্র চড়াই-উতরাই।
রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া থেকে শুরু করে রাজপথের কঠিন নিগ্রহ, সবটুকুই দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ।
তবে, এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার মূল দর্শন ও রাষ্ট্র মেরামতের দলিলকে যদি এক সুতোয় গাঁথা হয়, তবে তা ফুটে ওঠে একটি সূত্রে—১৯ দফা থেকে ৩১ দফা।
প্রতিষ্ঠালগ্নে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে উঠে আসা ১৯ দফা ছিল তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে একটি নতুন জাতিকে স্বাবলম্বী করার অঙ্গীকার। আর চার দশক পর ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী বাংলাদেশের ভগ্নস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা হলো রাষ্ট্রকাঠামো নতুন করে গড়ার পথনকশা।
শুরুটা যেভাবে, ১৯৭৭ সালের প্রেক্ষাপট
সময়টা ১৯৭৭ সাল। স্বাধীনতার কয়েক বছর পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখন নানা সংকটের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে। অর্থনীতি দুর্বল, খাদ্যসংকট প্রকট, গ্রাম-শহরের বৈষম্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব ও প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সামনে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বাকশালের মতো একদলীয় শাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে বের হয়ে আসা একটি দেশের জন্য নতুন দিশা প্রয়োজন ছিল।
এই বাস্তবতায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামনে আনলেন একটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি—১৯ দফা। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল জাতির সামনে ঘোষিত এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল আত্মনির্ভরতা, উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
তখনো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর প্রায় দেড় বছর পর, ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থাৎ বিএনপির রাজনৈতিক যাত্রার আগেই দলটির প্রতিষ্ঠাতা নেতার রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি হিসেবে ১৯ দফা সামনে আসে।
জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, স্বনির্ভর বাংলাদেশের দলিল
জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার দূরদর্শী দলিল। কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে এই ১৯ দফাকে জাতীয় জীবনের মূলনীতি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। প্রথমেই ছিল দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার। এরপর আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রতিফলন ঘটানোর কথা বলা হয়।
১৯ দফার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে জাতীয় ও গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা, দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কোনো মানুষ যেন না খেয়ে থাকে, এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি কাপড়ের জোগান বাড়ানো, গৃহহীনতা ও নিরক্ষরতা দূর করা এবং সবার জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করার কথা ছিল কর্মসূচিতে।
নারীর সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, যুবসমাজকে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা, বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দেওয়া, শ্রমিক-মালিকের সুসম্পর্ক তৈরি এবং সরকারি কর্মচারীদের জনসেবার মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ করার বিষয়ও ছিল ১৯ দফায়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সব দেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বের পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কথাও বলা হয়।
প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারও ছিল ১৯ দফায়।
সময় বদলেছে, বদলেছে চ্যালেঞ্জ
১৯ দফা ঘোষণার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু পরিবর্তন এসেছে। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দলের সংকটকালে হাল ধরেন বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি গণমানুষের প্রধান রাজনৈতিক আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দলটি সরকার গঠন করে এবং পরবর্তীকালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিরোধী রাজনীতির নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০১৭ সালে ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে বিএনপি নতুনভাবে রাজনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরে।
কিন্তু ২০১০-এর দশকের শেষভাগ থেকে রাজনৈতিক পরিবেশ আরও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিএনপির অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময়ের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে, বিরোধী দল দমন করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের শিকার হয়েছে। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বিএনপি রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের নতুন রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ নেয়।
সেখান থেকেই ৩১ দফার যাত্রা
২০২৩ সালের জুলাইয়ে বিএনপি তখন সরকারবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে। ১২ জুলাই ঢাকার সমাবেশ থেকে দলটি ‘এক দফা’ দাবি সামনে আনে, সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন।
এর পরদিন ১৩ জুলাই বিএনপি ঘোষণা করে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি শুধু একটি নির্বাচনী ইশতেহার নয়; বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক, প্রশাসনিক, বিচারিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় গুণগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা। অন্যান্য আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই রূপরেখাটি তৈরি করা হয়।
১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং স্বৈরাচার-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের তাগিদে বিএনপির চেয়ারম্যান (তখন ভারপ্রাপ্ত) তারেক রহমান এগিয়ে আসেন। বিএনপির দাবি, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শরিক হওয়া গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে ৩১ দফা গড়ে উঠেছে।
৩১ দফায় কী আছে?
৩১ দফার শুরুতেই রয়েছে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন ‘রেইনবো নেশন’ গঠন এবং ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য, এক ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার, রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক ও আইনগত প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সম্পূর্ণ স্বাধীন ও কার্যকর করা, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য কমিশন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ ভিত্তিতে সব ধর্ম ও জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজ ও শিল্প খাতের আধুনিকায়ন, জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কথাও বলা হয়েছে।
এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আধুনিক যুবনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, সড়ক-রেল-নৌ যোগাযোগের আধুনিকায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা ও পারমাণবিক শক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং পরিবেশবান্ধব আবাসন ও নগরায়ণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থাৎ ১৯ দফার যেখানে প্রধান সুর ছিল আত্মনির্ভরতা, উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়, সেখানে ৩১ দফার কেন্দ্রে এসেছে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান মেরামত, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন।
১৭ বছরের দুঃশাসন থেকে রাষ্ট্র মেরামতের রাজনীতি
বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে ৩১ দফার প্রয়োজনীয়তার পেছনে দীর্ঘ সময়ের আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উঠে আসে।
বিএনপি মনে করে, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে বের করে একটি কার্যকর, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৩১ দফাকে সামনে আনা হয়েছে।
২০২৫ সালের এক কর্মশালায় তারেক রহমান নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন, ৩১ দফার বার্তা শুধু দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। তার বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের অবস্থা থেকে রক্ষা করতে ৩১ দফার বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুর কাছে ১৯ দফা থেকে ৩১ দফার এই যাত্রা একটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার গল্প। যেখানে বদলেছে সময়, বদলেছে চ্যালেঞ্জ, কিন্তু মূল চেতনা আজও অটুট।
এক সাক্ষাৎকারের শুরুতে তিনি ফিরে যান দলের জন্মলগ্নে। তার ভাষ্য, ৪৬ বছর আগে যখন দলটি প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন অনেকেই এটিকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেছিলেন, এটি ক্ষমতায় বসে করা দল, সুবিধাবাদীদের আখড়া ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু সময়ই প্রমাণ করেছে, সমালোচকদের সেই ধারণা ভুল ছিল।
দুদুর মতে, বিএনপির ইতিহাস আসলে ত্যাগের ইতিহাস। এই দলটি যেমন বারবার ক্ষমতায় গেছে, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেছে সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের শিকার হয়ে। হামলা, মামলা, গুম সবকিছুর মুখোমুখি হয়েছে দলটি। খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এই নারী নেত্রী দলকে বিকশিত করেছেন, আবার মিথ্যা মামলায় জেলও খেটেছেন। অন্যদিকে জিয়াউর রহমান একজন জেনারেল হয়েও গণতন্ত্রকে শুধু পুনঃপ্রতিষ্ঠাই করেননি, বিকশিতও করেছেন। অথচ সেই গণতন্ত্রকেই কেড়ে নিয়েছিল বাকশাল নামের একদলীয় শাসন।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে এসে দুদু বলেন, এত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরও মানুষের আস্থার কেন্দ্রে এই দলই। বাংলাদেশ পুনর্গঠনে যখন অর্থনীতি বা আইনশৃঙ্খলা কিছুই ঠিক ছিল না, তখন আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিএনপি।
‘এই দল মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে’, এই কথার মধ্য দিয়েই তিনি দলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি চিহ্নিত করেন। তার মতে, বিএনপি শুধু স্লোগানে নয়, বাস্তবেও মানুষকে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছে। আর শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন। সেই কারণে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন শুধু বড় দলই নয়, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক দল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। এটাকে তিনি ইতিহাসের স্মরণযোগ্য ঘটনা মনে করেন।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে দুদু বলেন, বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি উৎখাত হলেও বিপদ একেবারে কাটেনি। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী একটি মুখোশধারী দেশ গণতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু তিনটি নির্বাচনে ফ্যাসিবাদকে সমর্থন দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
১৯ থেকে ৩১, একই ধারার দুই অধ্যায়
প্রায় অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক যাত্রায় বিএনপির সামনে এখন তাই একটি প্রশ্ন, ১৯ দফার যে রাষ্ট্রভাবনা দিয়ে যাত্রার বীজ রোপিত হয়েছিল, ৩১ দফা কি সেই ভাবনারই আধুনিক সংস্করণ?
বিএনপির বক্তব্য, উত্তরটি ‘হ্যাঁ’। দলটি বলছে, ৩১ দফা হঠাৎ করে তৈরি কোনো রাজনৈতিক কাগজ নয়; এটি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় তৈরি হয়েছে। বিএনপির নিজস্ব ব্যাখ্যাতেও ৩১ দফাকে ১৯ দফা ও ভিশন-২০৩০-এর ধারাবাহিকতায় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র সংস্কার পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
১৯৭৭-এর বাংলাদেশ আর ২০২৬-এর বাংলাদেশ এক নয়। চ্যালেঞ্জও এক নয়। তখন প্রশ্ন ছিল, কীভাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশকে উৎপাদনশীল ও আত্মনির্ভর করা যায়। এখন প্রশ্ন, কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা যায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা যায়, অর্থনীতিকে গতিশীল করা যায় এবং নাগরিকের অধিকারকে কার্যকর করা যায়।
১৯৭৭-এর ১৯ দফা যেমন তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তেমনি তারেক রহমানের ৩১ দফা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার সনদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সেই দীর্ঘ পথের এক প্রান্তে ১৯ দফা, অন্য প্রান্তে ৩১ দফা। আর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রাক্কালে দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে ১৯ দফা থেকে ৩১ দফার এই যাত্রাই হয়ে উঠছে একটি বড় রাজনৈতিক গল্প, রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার থেকে রাষ্ট্র মেরামতের প্রতিশ্রুতিতে পৌঁছানোর গল্প। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রভাতে বিএনপি এখন সেই ৩১ দফাকে সঙ্গে নিয়েই দেশের মানুষকে নিয়ে এক নতুন ভোরের পানে হেঁটে যাচ্ছে।


জাতীয়/তা/৩