এলাকায় উত্তেজনা
সুলতানি যুগের নিদর্শন উসমানপুর গায়েবি মসজিদের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ
প্রকাশিত: ৩০/১০/২০২৬ ০৮:০৫:০০ অপরাহ্ন
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উসমানপুর গ্রামের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ‘উসমানপুর গায়েবি মসজিদ’-এর মূল কাঠামোর ক্ষতিসাধন করে সেটিকে ঘিরে নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
মসজিদটির ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২১ মে বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি মসজিদ কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াকে ‘বেআইনি ও অনিয়মতান্ত্রিক’ দাবি করে গ্রামপঞ্চায়েতের একটি অংশ গত ৪ জুন ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত আপত্তি জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকার সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে বিষয়টি তদন্তের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। পরে কমিটির সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হয় বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় কমিটি গঠনের বিষয়টি তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও কোনো অনুমোদন ছাড়াই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলে গ্রামবাসীর একাংশের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গ্রামপঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ওয়াক্ফ প্রশাসক বরাবর এবং ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ আসনের সংসদ সদস্য বরাবর পৃথক আবেদন করা হয়।
এ ছাড়া মসজিদকে কেন্দ্র করে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা জানিয়ে গত ২৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়।
এ বিষয়ে অবগত হয়ে গত ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুরে ‘পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট’-এর চেয়ারম্যান ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি পর্যবেক্ষক দল মসজিদটি পরিদর্শন করে। এ সময় সার্বিক পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে দলটি সুলতানি আমলের বিরল নিদর্শন হিসেবে পরিচিত উসমানপুর গায়েবি মসজিদের মূল কাঠামো ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে প্রাচীন স্থাপনাটির বিকৃতি ও মূল কাঠামো ধ্বংস করে কোনো ধরনের নতুন স্থাপনা নির্মাণ না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
পর্যবেক্ষক দলে আরও উপস্থিত ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাব ও সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদের সাবেক সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরী, ট্রাস্টি ও পরিবেশ সংগঠক আব্দুল করিম কিম, অ্যাডভোকেট গোলাম সোবহান চৌধুরী দীপন, ইতিহাস গবেষক আসিফ আজহার, অ্যাডভোকেট সৈয়দ মনির হেলাল প্রমুখ।
মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে গ্রামের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মনির হেলাল বলেন, “প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের বরাতে জানা যায়, মসজিদটি সুলতানি আমলের শেষদিকে, ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ে মসজিদটি তালিকাভুক্ত করা হয়। মসজিদটির পরিচালনা, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে।”
মনির হেলাল অভিযোগ করে বলেন, “কথিত কমিটির সেক্রেটারি গ্রামপঞ্চায়েতকে অবহিত না করে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় অনিয়মের মাধ্যমে গঠিত কমিটির নাম ব্যবহার করে ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয় কিংবা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়াই প্রাচীন মসজিদটিকে চারদিক থেকে ঢেকে নতুন মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। এমনকি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এতে আমরা সচেতন গ্রামবাসী উদ্বিগ্ন।”
তিনি আরও বলেন, “ইতোমধ্যে এলাকার কয়েকজন সমাজহিতৈষী ব্যক্তি সালিশ ও আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। তাঁদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে এর আগেও ছিদ্দিকুর রহমান খান সালমান একাধিকবার এ ধরনের উদ্যোগ ও আপস-সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে আমাদের মধ্যে আশঙ্কাও রয়েছে।”
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ছিদ্দিকুর রহমান খান সালমান এর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে উনি ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত মসজিদটির মূল কাঠামো ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। একই সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।
কে ইউ এন